ঢাকা-১৬: দ্বিমুখী লড়াইয়ের মাঠে এগিয়ে বিএনপি
- প্রকাশের সময় : Feb 1, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন:
1768459961horizontal2.png
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঢাকা-১৬ সংসদীয় আসনে জমে উঠেছে নির্বাচনী প্রচারণা। এলাকার ভোটাররাও মেতে উঠেছেন নানা আলোচনা, সমালোচনায়। পাড়ার মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকান আর আড্ডার স্থানগুলোতে এখন প্রধান আলোচনার বিষয় নির্বাচন আর হার-জিতের প্রসঙ্গ।স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ আসনে জামায়াত আর বিএনপির মধ্যেই মূল লড়াই হবে।তবে শেষ পর্যন্ত জয়ের মালা পরবেন বিএনপি প্রার্থী আমিনুল হক।ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২, ৩, ৫, ৬, নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৬ আসন। পল্লবী ও রূপনগর থানা নিয়ে গঠিত এ আসনের এলাকাগুলো হলে- মিরপুর ১০, ১১, ১২, ৬, ৭ নম্বর, কালশী, পৌনে এক কাঠা, সাংবাদিক আবাসিক এলাকা, ঝুটপট্টি, এভিনিউ ফাইভ, সবুজ বাংলা, নাভানা, এক্সটেনশন পল্লবী,ইস্টার্ন হাউসিং, রূপনগর আবাসিক, রূপনগর পুকুরপাড় বা ঝিলপাড় বস্তি, মুসলিম বাজার, ধ-ব্লক, মিরপুর ডিউএইচএস, স্বাগুপ্তা, বাউনিয়াবাঁধ, লালমাইটা, বেগুন টিলা বস্তি ও সিরামিক বস্তি। এছাড়া এই আসনটিতে ৩৯টি বিহারী ক্যাম্প রয়েছে।এখানে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১ হাজার ১৬৮ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩২৩ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার রয়েছেন ৮ জন। ঢাকা-১৬ আসনের প্রার্থীরা হলেন: বিএনপির মো. আমিনুল হক, জামায়াতে ইসলামীর মো. আব্দুল বাতেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. সাইফুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মোহাম্মাদ তৌহিদুজ্জামান, মুক্তিজোটের আব্দুল কাদের জিলানী, গণঅধিকার পরিষদের মো. মামুন হোসেন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির এ কে এম মোয়াজ্জেম হোসেন, এনপিপির মো. তারিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির মো. নাজমুল হক, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের রাশিদুল ইসলাম ও জাতীয় পার্টির সুলতান আহম্মেদ সেলিম।স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী জাতীয় সংসদের ১৮৯ নম্বর এ আসনের মূল সমস্যা হলো- দিনের বেলায় তীব্র গ্যাস সংকট।জলাবদ্ধতা। পানির সমস্যা। ক্যাম্প ও বস্তি এলাকায় রয়েছে মাদক সমস্যা এবং কিশোর গ্যাং। এই ওয়ার্ডের ডি-ব্লক এলাকার বাসিন্দা শামীম হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, আমাদের এলাকায় তীব্র গ্যাস ও পানির সংকট রয়েছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত লাইনে গ্যাস থাকে না।ভোট কাকে দেবেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, যোগ্য প্রার্থীকেই আমরা ভোট দেব। সি-ব্লক এলাকার বাসিন্দা আলাউদ্দিন হোসেন বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় নানা সমস্যার মধ্যে বসবাস করছি। আমাদের এলাকায় বিহারী ক্যাম্প ৪টি। এলাকায় মৌলিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। এখানে চারটি ক্যাম্প থাকলেও বাস্তব অবস্থার তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। ক্যাম্পের ভেতরে ও আশপাশে মাদক, গাঁজা ও অন্যান্য অসামাজিক কার্যকলাপ চলে। এসবের কারণে এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বস্তি এলাকার আশপাশে এসব সমস্যা বেশি চোখে পড়ে। তিনি জানান, এলাকার সমস্যা সমাধানের জন্য যোগ্য প্রার্থীকেই ভোট দিতে চান।বেগুনটিলা বস্তির বাসিন্দা মোহাম্মদ আনোয়ার বলেন, আমাদের দুই নম্বর ওয়ার্ডে বিহারী ক্যাম্প ৪টি। এ কারণে এখানে মাদকের বেচাকেনা খুব বেশি হয়। উঠতি বয়সের ছেলেরা খুব দ্রুত অপরাধে জড়িয়ে পড়ে মাদকের কারণে। এই মাদক নিয়ন্ত্রণ না করলে আমাদের আগামীর ভবিষ্যৎ খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যাবে। এসব ক্যাম্পে ইয়াবা, গাজা বাংলা মদ ও ফেনসিডিল বিক্রি হয়।নির্বাচনী প্রার্থীদের প্রতি প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনে যেই নির্বাচিত হোক, তিনি যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মাদকের প্রভাবটা শক্ত হাতে নির্মূল করেন। ঢাকা-১৬ আসনের উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন এলাকাগুলো হলো: মিরপুর ১০ নম্বর, ঝুটপট্টি, প্যারিস রোড, ১১ নম্বর বাজার, ১১ নম্বর সিটি কর্পোরেশন মার্কেট, অরিজিনাল ১০ ও বেনারসি পল্লী এলাকা। এসব এলাকায় বর্ষাকালে অল্প বৃষ্টিতে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। সরু রাস্তা ও ড্রেনেজ সমস্যা রয়েছে। মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্তরের ফুটপাতে চাঁদাবাজি, মাদক, মশার উপদ্রব ও রয়েছে গ্যাসের সমস্যা। মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার বাসিন্দা কমল জোহা বাংলানিউজকে বলেন, আমাদের এলাকার রাস্তার ফুটপাত দিয়ে হাঁটা যায় না। এত হকার! আবার রয়েছে অটো রিকশার উৎপাত। এই রিকশাগুলো নিয়ম ও নীতিমালার মধ্যে আনা খুবই প্রয়োজন।আগামী নির্বাচনের কোন প্রার্থীকে ভোট দেবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এবার আমার ভোট দেওয়ার তেমন ইচ্ছে নেই। যদি ভোট দিতাম তাহলে বিএনপিকে দিতাম। তবে আমি জামাতকে ভোট দেব না।৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্যারিস রোড এলাকার এলাকার বাসিন্দা আফজাল মিয়া বলেন, প্যারিস রোড এলাকায় বর্ষাকালে বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। কালশী থেকে আসা একটি খাল খুবই সরু হওয়ায় এখান দিয়ে পানি সঠিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে না। এই ওয়ার্ডে রয়েছে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমস্যা। সঙ্গে রয়েছে মশার উপদ্রব। তিনি বলেন, এই আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থী ১০ জন হলেও লড়াই হবে জামায়াত আর বিএনপি প্রার্থীর মধ্যে। আমি এগিয়ে রাখবো বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আমিনুল হককে। তার জনপ্রিয়তাও যেমন প্রার্থী হিসেবেও তিনি যোগ্য।১১ নম্বর বাজারের চা দোকানদার মো. আসলাম বলেন, এই ওয়ার্ডে রয়েছে অনেক সমস্যা। ১১ নম্বর বাজারের রাস্তাটা এখনো ঠিক হলো না। সবচেয়ে বড় এই এলাকার আতঙ্ক ডিএনসিসি মার্কেট। ওই মার্কেটে প্রতিনিয়তই বসে মাদকের আড্ডা। সরকার পরিবর্তনের পর গত দুই বছরে এই মার্কেটে লাশ পাওয়া গেছে প্রায় চারটি। কে বা কারা এই মার্কেটে মানুষ মেরে ফেলে যায়। প্রশাসনিকভাবে মার্কেটের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া খুবই প্রয়োজন। ভোটের বিষয় জানতে চাইলে এই দোকানদার বলেন, এক জীবনে অনেক তো দেখলাম। বিএনপিও দেখছি, আওয়ামী লীগও দেখছি। এবার একটু জামায়াতকে ভোট দিয়ে দেখতে চাই। ক্ষমতায় গেলে তারা কী করে। এই আসনের অন্যতম ওয়ার্ড হচ্ছে ৫ নম্বর। এই ওয়ার্ডের আওতাধীন এলাকাগুলো হলো কালশী বালুর মাঠ বস্তি, ই-ব্লক, বাউনিয়াবাঁধ, পৌনে এক কাঠা, সাংবাদিক আবাসিক এলাকা, মুড়াপাড়া ক্যাম, রাবেতা ক্যাম্প, মিল্লাত ক্যাম্প, নাভানা, এভিনিউ ফাইভ, আলমপিগুলি, সবুজ বাংলা, লাল মাইট্টা, খিচুরিপট্টি বস্তি ইত্যাদি।এই এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম সমস্যা হচ্ছে কালশী রোডে বর্ষাকালে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। রয়েছে ড্রেনের ও গ্যাসের সমস্যা। বিদ্যুৎ ও পানি চুরির ঘটনা রয়েছে। আরো রয়েছে মাদক কেন্দ্রিক ও চাঁদাবাজির মত ঘটনা। এছাড়া মশার উপদ্রব তো আছেই।সাংবাদিক আবাসিক এলাকার বাসিন্দা সাবরিন সুলতানা বলেন, এই এলাকার অন্যতম সমস্যা হচ্ছে গ্যাস থাকে না। বর্ষায় জলাবদ্ধতার কারণে আমাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সাংবাদিক প্লটের পাশের বড় ড্রেনের কারণে মশার উপদ্রব বেশি। নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থীদের কাছে আমার চাওয়া, এলাকার সমস্যাগুলোর সমাধান।এই এলাকার আরেক স্থায়ী বাসিন্দা জিকো আহমেদ বলেন, সব ওয়ার্ডে, সব আসনেই সমস্যা আছে। দেশে ১৭-১৮ বছর পর গণতান্ত্রিকভাবে ভোট হবে এবার। এবারের ভোট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভোট দেব ধানের শীষে। ঢাকা-১৬ আসনে জয় হবে আমিনুল হকের।কালশী রোডের চা দোকানদার মো. সোহেল বলেন, নির্বাচনে এই এলাকায় এবার বিএনপির প্রচারণা অনেক বেশি। জামায়াতের একটু আছে, অন্য প্রার্থীদের সমর্থক খুঁজেই পাওয়া যায় না। আমার দোকানে যারা বসেন, তারা অধিকাংশই বিএনপির সমর্থক। ৫ নম্বর ওয়ার্ডে বাউনিয়াবাঁধ এলাকার বাসিন্দা মো. সামসুল আলম বলেন, এখানে মাদক ও চাঁদাবাজির সমস্যা আছে। বিভিন্ন মোড়ে বিক্রি হয় গাজ, ইয়াবা ও হোরোইনের মতো মাদক। দোকান ও রিকশার গ্যারেজ থেকে নামে বেনামে তোলা হয় চাঁদা। প্রশাসনিকভাবে এই সমস্যাগুলো ব্যবস্থা নেওয়া খুবই প্রয়োজন। ঢাকা-১৬ আসনের সর্বশেষ ওয়াড ৬ নম্বর। এই ওয়ার্ডের এলাকাগুলো হলো রূপনগর আবাসিক, বর্ধিত পল্লবী, শিয়ালবাড়ি, ইস্টার্ন হাউজিং, ৬ নম্বর বাজার, মিরপুর ১২ নম্বর, চলন্তিকার মোড়, মিল্ক ভিটা, রূপনগর পুকুরপাড় বা ঝিলপাড় বস্তি ইত্যাদি। এই ওয়ার্ডের সমস্যা চাঁদাবাজি, মাদক কারবারি, বস্তিতে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি চুরি, জুয়া, মশার উপদ্রব ইত্যাদি।মিরপুর ১২ নম্বর বর্ধিত পল্লবীর ফয়সাল আহমেদ বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে নতুন গতি এসেছে। এই নির্বাচনকে অনেকেই টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছি। নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সহিংসতা এড়ানো, ভোটকেন্দ্র নিরাপদ রাখা এবং ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। ভোটারদের মধ্যে আগ্রহের পাশাপাশি উদ্বেগও আছে—ভোট আদৌ স্বাধীনভাবে দেওয়া যাবে তো?
নিউজটি আপডেট করেছেন :
নয়াদিন ডেস্ক
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
নয়াদিন ডেস্ক